আমলকির উপকারিতা ও অপকারিতা

আমলকির উপকারিতা ও অপকারিতা

আমলকি কি? আমলকি একটি ফাইলান্সাসি পরিবারের ফাইলান্সুস গনের একপ্রকার ভেষজ জাতীয় ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম (Phyllanthus emplica)। সংস্কৃত ভাষায় এটির নাম হয় ” আমলক”। ইংরেজিতে বলা হয় Amla বা বৃক্ষ। আমলকি দেখতে কিছুটা হালকা সবুজ ও হলুদ রঙের গোলাকৃতির মতো হয়। 

আমলকি তেঁতো ও টক স্বাদ বিশিষ্ট হলেও এটির হাজারো গুনাগুন রয়েছে। আমলকি এমন একটি ভেষজ জাতীয় ফল এটি মানবদেহের বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যকটেরিয়া খুব সহজেই ধ্বংস করতে পারে। আমলকির পাতা, ফল ও গাছের ছাল দিয়ে বিভিন্ন ঔষধ তৈরি করা হয়। আজকে মৃলত আমরা বহু ঘুনসম্পন্ন এই আমলকির উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত জানবো।


আমলকির পুষ্টি উপাদান সমূহঃ-

আমলকি ফলটির বেশ কিছু ভেষজ গুন রয়েছে। আমলকিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন ও খনিজ ইত্যাদি রয়েছে। এছাড়াও আমলকির পাতা ও ফল ঔষধ হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে।

আমলকি কখন পাওয়া যায়?

বছরের ১২ মাসেই আমলকি বাজারে পাওয়া যায়। তবে শীতকালীন সময়ে আমলকি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। শীতের মৌসুমে আমলকি খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। শীতের সময়ে আমাদের শরীরে রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। এতে করে শীতকালে আমলকি খেলে সারা বছর সুস্থ থাকা যায়। তাই বলা যায়, শীতকালে রোগ প্রতিরোধ কারি ফলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমলকি।

আমলকি খাওয়ার নিয়ম বা পরিমানঃ-

একজন ব্যক্তির দৈনিক এক দুইটা আমলকি খাওয়া প্রয়োজন। কেননা আমলকিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও অন্যান্য উৎস। আমলকিতে রয়েছে ভিটামিন-সি যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সহজেই সুস্থ থাকতে সহয়তা করে। এছাড়া আমলকিতে শারীরিক সুস্থতা ও শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন সকলের পরিমান মতো আমলকি খাওয়া উচিত। যাতে করে মানুষ শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে সবসময় সুস্থ থাকতে পারে।

খালি পেটে আমলকি খাওয়ার উপকারিতাঃ

আমরা অনেকেই তারুণ্য ধরে রাখতে সকালে খালি পেটে লেবুর রসের পানি খেয়ে থাকে। কারন লেবুতে রয়েছে ভিটামিন-সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অতিরিক্ত মেদ কমায়। তবে লেবুর পাশাপাশি আমলকিও বেশ ভূমিকা রাখে। কয়েকটি আমলকি টুকরা করে কেটে কুসুম পানির সাথে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেয়ে নেন দেখবেন লেবুর পাশাপাশি আমলকিতে ও বেশ উপকার পাবেন।

আমলকির উপকারিতা সমূহঃ-

আমলকি এমন একটি ভেষজ জাতীয় ফল যা মানবদেহের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এটি শরীরের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও জটিল সমস্যার সমাধান করে থাকে। আমলকির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা সমূহ আলোচনা করা হলোঃ-
  • আমলকি খাওয়ার রুচি বাড়াতে সহয়তা করে। 
  • অতিরিক্ত বমি ভাব দূর করে। 
  • হৃদযন্র ও মস্তিষ্কের উপকার করে থাকে।
  • পেটের বদহজম সারাতে সহয়তা করে। 
  • আমলকি চুল, দাঁত ও ত্বক ভালো রাখতে সহয়তা করে।
  • কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহয়তা করে। 
  • শরীরের ভিটামিন ঘাটতি পূরন করে। 
  • রক্ত পরিষ্কার করতে সহয়তা করে। 
  • সর্দি কাশি জ্বর সারাতে সহয়তা করে। 
  • হজম শক্তি ও পেটের সমস্যা সমাধান করে। 
  • পাইলসের সমস্যা সমাধান করে। 
  • রক্ত শূন্যতার অভাব দূর করে। 
  • ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে সহয়তা করে। 
  • অতিরিক্ত মেদ কমাতে সহয়তা করে। 
  • চোখের সমস্যা ও দৃষ্টি শক্তি বাড়াতে সহয়তা করে। 
  • নিঃশ্বাসের দুগন্ধ দূর থাকে। 
  • যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে থাকে। 
  • মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। 

খাওয়ার রুচি বাড়াতেঃ

আমলকি কিছুটা টক ও তেতো এটি মুখের রুচি ও স্বাদ বাড়ায়। এটি খাওয়ার ফলে মুখের ভিতর মিষ্টি ভাব চলে আসে। আমলকির গুড়োর সাথে সামান্য পরিমান মধু ও মাখন মিশিয়ে খেলে আপনার মুখের রুচি বৃদ্ধি ও খিদে বেড়ে যাবে।

বমি ভাব দূর করতেঃ

আমলকি বমি ভাব দূর করে থাকে। আমলকির রসে ৫-১০ গ্রাম চিনি মিশিয়ে পান করুন। এতে করে বমি ও হেঁচকি ভাব বন্ধ হবে। এছাড়াও আমলকির গুঁড়ো ৫-১০ গ্রাম পানির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে খেলে বমি ভাব দূর হবে।

হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের সুস্থতায়ঃ

আমলকি হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও মস্তিষ্কের শক্তি বর্ধন করে। আমলকির আচার ও মোরব্বা মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় সহায়তা করে।

বদ হজম সারাতেঃ

আমলকি বদ হজম সারাতে সহয়তা করে। আমলকির রস করে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর হয়। এছাড়াও পেটের গোলযোগ ও বদ হজম সারাতে সহয়তা করে।

চুল ও ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতেঃ

আমলকি চুল ও ত্বকের পরিচর্যা হিসাবে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমলকিতে আছে প্রোটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিড যা এটি চুলের গোড়া মজবুত ও চুল বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। চুলের খুশকি দূর করে এবং পাকা চুল প্রতিরোধ করে। 

আমলকির রসের সঙ্গে প্রতিদিন সকালে মধু মিশিয়ে খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে। এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেঃ

আমলকি রক্তের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখে। এতে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সহয়তা করে। রক্তের কোলেস্টেরল এর লেভেলও কম রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

জ্বর সর্দি কাশি সারাতেঃ

আমলকির রস সর্দি কাশি জ্বর ও ফ্লুর জন্য খুবই উপকারী। আমলকির রসের সঙ্গে দুই চা চামচ মধু মিশিয়ে পান করলে সর্দি কাশি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়াও মুখের ঘা সারাতে আমলকির রস গার্গাল করলে উপকার পাবেন।

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে আমলকিঃ

আমলকির মধ্যে রয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান যা ক্যান্সার প্রতিরোধি গুণ। আমলকি মানবদেহে ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধিতে বাঁধা দিয়ে থাকে। আমলকি শরীরের বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সহয়তা করে এবং উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সহয়তা করে।

পাইলস থেকে মুক্তি পেতে আমলকিঃ

অশ্ব মানে পাইলস এটি কোষ্ঠকাঠিন্য জনিত রোগ। প্রায় দেখা যায় মশল্লাদার খাবার খান তাদের এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়। এই উপকারের জন্য আমলকির ব্যবহার খুব কার্যকর। অশ্বরোগে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ দেখা দিলে আমলকির গুঁড়া ৩-৮ গ্রাম টক দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিনে ২/৩ বার খেতে হবে। এতে করে পাইলসের সমস্যা দূর হবে।

হার্ট সুস্থ রাখতে আমলকির উপকারিতাঃ

আমলকি হার্ট সুস্থ রাখতে সহয়তা করে। আমলকিতে রয়েছে ভিটামিন-সি যা রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া রোধ করে। রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহয়তা করে যা রক্ত চাপকে ও স্বাভাবিক রাখে।

স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি বিকাশে আমলকির উপকারিতাঃ

আমলকি স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি বিকাশে সহয়তা করে। আমলকিতে পাওয়া যায় রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য যা স্মৃতিশক্তি ও মনকে তীক্ষ্ণ করতে সাহায্য করে।

আমলকির অপকারিতা সমূহঃ-

আমলকির কার্যকরী উপকারিতা থাকলেও এটির বেশ কিছু অপকারিতা রয়েছে। কেননা কোন কিছু অতিরিক্ত না খাওয়ায় ভালো। আবার কিছু কিছু মানুষের জন্য এটি না খাওয়ায় ভালো যেমন–

  1. কোন সার্জারি বা অপারেশন হলে আমলকি খাওয়া যাবে না। 
  2. ব্লাড থিনিংয়ের ঔষধ খেলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। 
  3. যারা অন্তঃসত্ত্বা তাদের আমলকি না খাওয়া ভালো। 
  4. দুগ্ধ দানকারী মহিলারা আমলকি না খাওয়া ভালো।
জুস বা অন্য কোনোভাবে খাওয়ার থেকে আমলকি চিবিয়ে খাওয়াই ভালো। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১-২টি আমলকি খাওয়া যায়। এতে সবচেয়ে বেশি উপকার হয়। তবে দিনে দু’একটির বেশি আমলকি খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। এ কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

হার্টের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বেশি মাত্রায় আমলকি খাওয়ার অভ্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের সমস্যা থাকলে ফলটি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ ফল শরীরের তাপমাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তাই বেশি পরিমাণে আমলকি খেলে জ্বর-সর্দি বা কাশি হতে পারে।

পরিশেষেঃ

আশা করি আজকের এই টপিকঃটির মাধ্যমে আমলকির উপকারিতা ও অপকারিতা  সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন। আজকের এই আর্টিকেলটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন প্রশ্ন বা মতামত থেকে থাকে তাহলে নিচের কমেন্ট বক্সে আমাদেরকে জানাতে পারেন।

Post a Comment

ব্যাকলিংক পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ইরিলেভেন্ট লিংক শেয়ার করার চেষ্টা করবেন না । স্পামিং করা থেকে বিরত থাকুন । আপনার লিংকটি যুক্তিসঙ্গত না হলে সেটি অ্যাপ্রুভ করা হবে না ।

নবীনতর পূর্বতন